"কাটরাপোতা জামে মসজিদ"।
বর্ধমান একটি প্রাচীন জনপদ, এই জনপদে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনজাতি রাজত্ব স্থাপন করেছেন ।আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো যে ১২০২ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাঠানরা বর্ধমানে রাজত্ব করেছেন এবং কাঞ্চননগর ছিল তাদের রাজধানী। ১৫৭৪ - ৭৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আকবর বাংলা অভিযান করেন, এবং পাঠান দের পরাভূত করে মুঘলদের শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন। এবং কাঞ্চন নগর এ ই রাজধানী স্থাপন করেন।
কাঞ্চন নগরের পূর্বে এই জনপদের নাম কাটরা পোতা। এই মসজিদের নাম কাটরা পোতা জামে মসজিদ।
"কাটরা" একটি আরবি শব্দ এর অর্থ অবকাশ যাপন কেন্দ্র বা সরাইখানা।( ক্যারা ভ্যান সাবাই)। এবং "কাটরা" ফার্সি অর্থ বাজার বা বাণিজ্য কেন্দ্র যা সচরত নদীর তীরে অবস্থান করে।
পোতা অর্থাৎ স্থাপন করা, (তবে পোতা শব্দটি অন্য কোন আরবি বা ফার্সি শব্দের অপভ্রংশ হতে পারে যা খালি চোখে বোঝা যাচ্ছে না) মুঘল যুগে বা পাঠান যুগে এই এলাকায় একটি বড় সরাইখানা ও বাজার বা বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল, তার থেকেই এর নাম কাটরা হয়েছে, বলেই সহজে অনুমান। পরবর্তীকালে এটি কাটরা পোতা নামে অভিহিত হয়েছে বলেই অনুমান।
কাটরা পোতা মসজিদ তিন গম্বুজ ও চারটি মিনার দ্বারা সুশোভিত মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন। অবশ্যই চুন সুড়কি দ্বারা নির্মিত এবং খিলেনের কাজ করা, ও সুরভিত নকশা দ্বারা পুরো মসজিদ পরিপূর্ণ। মসজিদটি স্থাপিত হয়েছিল বাঁকা নদীর উত্তর পাড়ে, এবং কাটরাপোতা এলাকা বা গ্রামের ঠিক মধ্যস্তলে।
এই মসজিদের একটি বৈশিষ্ট্য দেখতে পেলাম যে, গম্বুজ তিনটি ই ডবল লেয়ারের অর্থাৎ একটি গম্বুজের উপর আরেকটি করে গম্বুজ চাপানো আছে (দ্বিস্তর) এবং প্রত্যেকটির একটি করে দরজা আছে। যা আমি অন্য কোন মসজিদের গম্বুজে দেখতে পাইনি।
মসজিদের ফার্সি শিলালিপি থেকে জানতে পারা যায় যে, এই মসজিদটি ১২৪৩ হিজরী অর্থাৎ ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ ২০০ বছরের পুরাতন এই মসজিদ।
মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন কাটরা পোতা এলাকার জমিদার, দেওয়ান জনাব এ আলী এবং ওনার স্ত্রী কাতেবা আলী রেজা।
উক্ত জমিদার জনাবে আলী ও ওনার স্ত্রী কাতেবা আলী রেজা মসজিদে নামে প্রায় ৪০বিঘা জমি দান করেছিলেন, বর্তমানে ৩ বিঘা জমি ও একটি মসজিদের পিছনে পুকুর বিদ্যমান।
১৪৫ দাগের খতিয়ান ৫০৪ মাত্র ১১ শতক মসজিদ, এবং ১৪৬ দাগের খতিয়ান ৫০৪ মাত্র ১৪ শতক ডাঙ্গা বর্তমান যা একটি মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে।
১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মহামারী ও একটি দাঙ্গায় এলাকা মুসলিম শূন্য হয়ে যায়। অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ এই এলাকায় থেকে যান। (এলাকার মানুষের বক্তব্য)।
১৯৪৭ সালে দেখা যায় মাত্র ১৮ টি বাড়ি মসজিদের সামনে বাসযোগ্য ছিল।
এলাকার বুদ্ধিষ্ণু জমিদার পরিবারের মানুষজন যথা সুফি মহিউদ্দিন আহমদ পিতা সুফি কেয়াম উদ্দিন আহমদ, তার পিতা ডাক্তার নাজির আহমেদ , ১৯৬৭- ৬৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ চলে যান, অজ্ঞাত কারণে। তাদের সব সম্পত্তি বাংলাদেশ থেকে আগত উদ্বাস্তু জনগণ দখল করে নেন।
বন্যার সময় বেশ কিছু মানুষ বাড়িঘর নষ্ট হয়ে গেলে মসজিদে আশ্রয় নেয়, বন্যার পরিস্থিতি ঠিক হলে ওই সমস্ত ঘরের মানুষজন মসজিদের পাশে র কবরস্থানে বসতি স্থাপন করে ফেলেন এবং আজও তারা ওখানেই বসতি স্থাপন করেই আছেন।
১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলার প্রখ্যাত আলেম মরহুম মোজাম্মেল হক সাহেব মসজিদের সামনে একটি মাদ্রাসা পরিচালনা শুরু করেন যা আজও বিদ্যমান এর পরিচালন কমিটি সঙ্গে মসজিদ কমিটির যৌথভাবে মাদ্রাসাটা পরিচালনা করেন।
উক্ত এলাকার মানুষজনের মৃতদেহ সংস্কার করার জন্য আরও কয়েকটি কবরস্থান অবশ্য আছে ,যেমন লাকুড্ডী (ওয়াকাফ্ আমায় নাম আছে কাশেমনগর) দত্ত রাইস মিলের পাশে ১৭৮ শতক কবরস্থান যা বিগত বাম সরকারের সময়, দাসী কোরা নামক বৃদ্ধাকে অর্ধেক বসতি স্থাপনের জন্য জোর করে দিয়ে দেওয়া হয়। কিছু জায়গা N H রাস্তা করার জন্য নিয়ে নেয়। দ্বিতীয় আরেকটি কবরস্থান বিরুটি কুড়ি JL 27 পরিমাণ চার বিঘা কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার হয়। এছাড়াও প্রাথমিক স্কুলকে ব্যবহারের জন্য দশ কাটা কবরস্থান ছেড়ে রাখা আছে।
শেখ মনোয়ার হোসেন - বর্ধমান।১৯/১/২৩






No comments:
Post a Comment